বীরভূম: সকাল থেকে রাত, গত বুধবার দিন যত গড়িয়েছে বীরভূমের মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে বেরিয়েছে কোটি কোটি টাকার নোট ও সোনার বাট। তারপরই প্রকাশ্যে আসে জেলার ‘পাথরসম্রাট’ নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের নাম। এক সময় মাথায় ঝুড়ি নিয়ে লরিতে পাথর বোঝাই করা টুলু কীভাবে হলেন ‘পাথরসম্রাট’? তদন্ত হতেই একের পর এক ভয়ঙ্কর তথ্য সামনে এসেছে। তবে যে তথ্যটি মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে, সেটি হল নিজের ছাপাখানায় সরকারি DCR নকল করে দিনের পর দিন চলছে কালোবাজারি। এখন প্রশ্ন, কীভাবে চলত টুলুর ‘মাফিয়া চক্র’? তা জানতে শুক্রবার বীরভূমের পাথর খাদান থেকে DCR গেট থেকে চেকপোস্ট ঘুরে দেখল এবিপি আনন্দর ক্যামেরা। জানেন কী কী ধরা পড়ল ?
ঠিক কীভাবে চলত টুলু মণ্ডলের চক্র?
খাদান থেকে পাথর তোলার পর ক্রাশার। তারপর ক্রাশার থেকে ভাঙা পাথর নিয়ে DCR গেট হয়ে মোটর ভেহিকেল চেকপোস্ট। এটাই ছিল বীরভূমের মহম্মদ নাজিবুদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডলের কারবারের রুটম্যাপ। বা অন্য় কথায় বললে, তার দুর্নীতির সাম্রাজ্য় তৈরির রাস্তা। বীরভূমের মহম্মদবাজার, রামপুরহাট থেকে নলহাটি এলাকায় রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য খাদান ও ক্রাশার। খাদান থেকে পাথরের নিয়ে যাওয়া হয় ক্রাশার ইউনিটে। সেখানে বড় বড় পাথর ভেঙে তৈরি হয় বিভিন্ন মাপের স্টোন চিপস। স্টোন চিপস ক্রাশার থেকে লরি ভর্তি হয়ে DCR গেট হয়ে চলে যায় বাজারে। টুলু মণ্ডলের দুর্নীতি ধরা পড়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তাঁর DCR গেট। তার জায়গায় সোঁতশোল গ্রামে নতুন DCR গেট তৈরি করেছে প্রশাসন।
পুলিশ সূত্রে খবর, টুলু মণ্ডলের আসল খেলা শুরু হত এই DCR গেটেই। পাথর বোঝাই লরি যখন বাজারে যায়, তখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি হল Duplicate Carbon Receipt বা DCR.অরিজিনাল DCR-এ উল্লেখ থাকে, ক’টি লরিতে করে কত পরিমাণ স্টোন চিপস বাজারে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারকে ফাঁকি দিতে ডুপ্লিকেট DCR তৈরি করতেন টুলু। লরির সংখ্যা ও পাথরের ওজন কম করে দেখানো হত। DCR গেট থেকে বেরনোর পর পাথরবোঝাই লরিকে যেতে হয় মোটর ভেহিকেলের চেকপোস্ট পেরিয়ে। সেখানে দেখা হয় পাথরের ওজন ঠিক আছে কিনা বা ওভারলোড রয়েছে কিনা। কিন্তু অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টুলু মণ্ডলের দেওয়া ডুপ্লিকেট DCR দেখেই ছেড়ে দেওয়া হত লরি। DCR গেট থেকে বেরনোর পর অন্য রাস্তা ধরেও ফাঁকি দেওয়া যেত মোটর ভেহিকেলের চেকপোস্টকে। ৯টি জায়গায় DCR গেট রয়েছে বীরভূমে। প্রশান্ত গোপ নামে এক লরির খালাসি জানান, ‘ওভার লোড করলে টাকা দিলে হয়ে যেত।’ পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে খবর, ডুপ্লিকেট DCR-এ লরির সংখ্যা ও পাথরের ওজন কম করে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করতেন টুলু। পাশাপাশি অভিযোগ, ওভারলোডিং থেকেও পকেট ভরতেন পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল।
টুলু মণ্ডলের ঘটনায় মুখ্য়মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, “গত সরকারের সময় যেখানে পাথর থেকে বছরে ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা রেভেনিউ আসত। সেখানে গত ১১ মে থেকে ১১ জুনের মধ্যে, এই এক মাসে বীরভূমের পাথর খাদন থেকে আমরা ৮৩ কোটি টাকা পেয়েছি। যেটা ইতিমধ্যে ১০০ কোটির কাছে চলে গিয়েছে। এবং আমি সব জায়গায় বলছিলাম যে ১০০ কোটি টাকা সরকারের ঘরে জমা হত, বাকি ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা সাইফন হত অর্থাৎ বেরিয়ে যেত।”
