Voice of Eastern India

SSC Scam: চাকরি কেড়ে নিয়েছেন, লাথি মেরেছেন ; প্রাক্তন শাসকদলকে তীব্র নিশানা চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষক অমিতরঞ্জনের, চাকরি ফিরিয়ে দিন, আর্জি নতুন সরকারের কাছে


কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সব থেকে বড় নিয়োগ দুর্নীতি হল অবশ্যই শিক্ষা দুর্নীতি। চাল থেকে কাঁকর আলাদা করার দায়িত্ব ছিল যাদের, সেই স্কুল সার্ভিস কমিশন নিজেরাই এই চুরিতে যুক্ত। আর চোর ধরার দায়িত্ব ছিল যাদের উপর সেই সিবিআইও কার্যত ফেল করেছে। আর তারই জেরে বাতিল হয়েছে ২৬ হাজার চাকরি। যার মধ্যে একটা বিরাট অংশ মেধার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়া যোগ্য শিক্ষক। এমনই একজন উপস্থিত ছিলেন এবিপি আনন্দের ‘শুনুন মুখ্যমন্ত্রী’ অনুষ্ঠানে। চাকরি ফেরানোর দাবিতে তিনি রাস্তায় নেমেছেন। উদ্ধত পুলিশের লাথি খেয়েছেন। তাঁর পিঠে ভাঙা হয়েছে পুলিশের লাঠি। সেই লাঠি হাতে নিয়ে রক্তাক্ত শরীরে তিনি কথা বলেছেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। তিনি চাকরি হারা যোগ্য শিক্ষক অমিত রঞ্জন ভুইঞা।

তৃণমূলের সেই প্ল্যান এ, প্ল্যান বি, প্ল্যান সি যে কত বড় ভাঁওতা, সেটা দেখা গিয়েছে। কিন্তু বিজেপি সরকার শেষ পর্যন্ত প্রতি বছর এসএসসি, টেট, স্বচ্ছ ভাবে পরীক্ষা নেওয়া, রেজাল্ট বের করা এবং নিয়মিত শিক্ষকদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবে তো? প্রথম কয়েক দিনে আমরা দেখেছি সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা পাঁচ বছর বেড়েছে। আর ২০২৬ সালের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার OMR সিট নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন। কিন্তু তাতে কি ভরসা পাচ্ছেন অমিত রঞ্জন ভুইঞার মতো শিক্ষকরা? কী বলছেন তিনি?

অমিত রঞ্জন ভুইঞা সরাসরি তাঁর আগের বক্তার বক্তব্য ধরেই বলা শুরু করলেন, “আমার আগের বক্তা প্রশ্ন তুললেন পশ্চিমবঙ্গে কি কিছুই হয়নি? হয়েছে তো। গরু চুরি হয়েছে, বালি চুরি হয়েছে, মেধা চুরি হয়েছে, যোগ্যদের চাকরি চুরি হয়ে গিয়েছে। আপনার বলুন তো গত ১৫ বছরে আপনারা কতগুলো পরিচ্ছন্ন নিয়োগ করেছেন? কতগুলো নিয়োগ করেছেন, সেটা সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্ট দেখেনি? বলতে পারবেন? একটাও পারবেন না। দিনের পর দিন রাতে, আমরা যোগ্যরা কেঁদেছি, রাস্তায় পড়ে থেকেছি, লাথি খেয়েছি। মানুষ বলে শিক্ষক নাকি জাতির মেরুদণ্ড। সেই শিক্ষকের মেরুদণ্ডে আপনাদের চোর, দুর্নীতিবাজ সরকার লাথি মেরেছে। বিদ্যাসাগরের মাটিতে এটা চরম লজ্জার। আমি কাঁদতে কাঁদতে একদিন এবিপি আনন্দে বলেছিলাম যে এই অন্যায়ের জবাব আপনাদের দিতে হবে। বাংলার মানুষ সুদে, আসলে উসুল করবেই। বাংলার মানুষ উসুল করেছে। আপনাদের নেতামন্ত্রীরা, গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, উপপ্রধান মেম্বার তাঁদের অট্টালিকা। আর আমরা যারা ফিজিক্সে, কেমিস্ট্রিতে, অঙ্কে, ইংরেজিতে এমএ, বিএড, এমএসসি, পিএইচডি, অন্যান্য চাকরি ছেড়ে নিজের বাড়ির কাছাকাছি, নিজের রাজ্যে সেবা করার জন্য, নিজের গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য, শিক্ষকের পেশাটাকে বেছে নিয়েছিলাম, সেটা আমাদের অন্যায় হয়েছিল? আপনারা চাল আর কাঁকর একসঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।”

চাকরিহারা শিক্ষক অমিত রঞ্জন ভুইঞা সরাসরি তোপ দাগলেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত তৃণমূল নেতা ও বিধায়কদের উদ্দেশ্যে। তিনি বলেন, “আপনার যে কাণ্ডগুলো করে গিয়েছেন, তাতে আমি জানি না আমার চাকরিটা আছে কি নেই।  তার জন্য দায়ী কে? আপনারা তো। আমি প্রশ্ন করব না আপনাকে? আমার বেতন অগস্ট পর্যন্ত। ১৯ হাজার যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষিকা ও শিক্ষকর্মীদের বেতন অগস্ট পর্যন্ত। তাঁরা জানে না তাঁদের চাকরিটা থাকবে কি না। তাঁরা জানে না তাঁদের কি অন্যায়? এমন ঘেঁটে দিয়ে গিয়েছে আপনাদের এই অপদার্থ, চোর, সরকার। কলকাতার মোড়ে মোড়ে আপনারা সুফল বাংলা খুলেছেন। কিন্তু বাংলার মানুষ জানতো না সুফল বাংলার সবজি মাণ্ডিতে আপনারা মেধাবী যোগ্যদের চাকরিগুলো বিক্রি করবেন অর্থের বিনিময়ে। একটা অপদার্থ, চোর, দুর্নীতিবাজ সরকার। আগে আপনাদের দায় নিতে হবে। তারপর আমি নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা দাবি করব। আপনারা কোনও কথা বলবেন না। আমি অল্প বয়সে আমার বাবাকে হারিয়েছে। আমার মতো হাজার হাজার ছেলেরা সংগ্রাম করে, লড়াই করে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে এসেছে শুধুমাত্র শিক্ষকর পেশাকে বেছে নিয়ে। পিএইচডি করেছে ফিজিক্সে, কেমিস্ট্রিতে, ম্যাথেমেটিক্সে। তাঁরা অন্যায় করেছেন? আর এই পেশাটাকে নিয়ে বেশি বড় বড় ডায়লগ দিচ্ছেন মঞ্চে বসে বসে। আপনাদের কোনও অসুবিধা হয় না। আমার পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে। আমাদের ওই ১৯ হাজার যোগ্যদের দায়িত্ব কে নেবে। আমি বলব, আমাকে বলতে দিতে হবে।”

আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলতে গিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা তৃণমূল নেতা। তাঁকে চুপ করিয়ে দেয় চাকরিহারা শিক্ষক অমিত রঞ্জন ভুইঞার চাঁচাছোলা বক্তব্য। তিনি বললেন, “আপনারা বলছেন কিছু করেন নি। আপনাদের দুষ্কর্মের জন্য প্রশান্ত স্যার, সুবল স্যার তাঁরা আজ পৃথিবীতে নেই। কেন? মারা গিয়েছেন। অনেকে ডিপ্রেশনে। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, সাইকোলজিস্টের কাছে ভিড় লেগে গিয়েছে। পাগল হওয়ার মতো উপক্রম। ওঁদের কাছে দাবি তো আমরা জানাবই। কিন্তু আপনার আমাদের সঙ্গে কেন এমন করলেন, তার কৈফিয়ত আমরা চাইব না আপনাদের কাছে? কেন আমাকে লাথি মেরেছিলেন? কেন পুলিশ দিয়ে আমাদের সহকর্মীদের চোখ নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা করেছিলেন বিকাশ ভবনের বাইরে? প্রশ্ন করব না আপনাদের? তার পাপের শাস্তি আপনারা পেয়েছেন। এবং আপনাদের এর দায় নিতে হবে। সব থেকে বড় ক্ষতি আপনারা কী করেছেন জানেন? বাংলার গরিব বাড়ির ছেলে মেয়েরা যে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আপনারা শেষ করে দিয়েছেন। আপনারা বই দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। জুতো দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সাইকেল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু শিক্ষক দেওয়ার ব্যবস্থা করেননি। এবং কী করেছেন? পয়সার বিনিময়ে অযোগ্যদের এই স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। কোনও ছাড় হবে না আপনাদের। যে কষ্টে আমরা প্রতি রাতে কাঁদছি, কত লোক, কত শিক্ষক ডিপ্রেসনের ওষুধ খাচ্ছে। পাগল হওয়ার মতো উপক্রম। তার দায় নেবেন না আপনারা? তাঁদের আবার দ্বিতীয়বাদ পরীক্ষায় বসিয়েছেন। ৪০ বছর, ৪৫ বছর, ৫০ বছরের শিক্ষক শিক্ষিকাদের। লজ্জা করে না আপনাদের। তাঁরা যদি পাশ না করে তাহলে তাঁদেরকে, তাঁদের ছেলেমেয়েদের, তাঁদের ফ্যামিলির দায়িত্ব কে নেবে? আমার চাকরি কেড়ে নিয়েছেন। আমাকে লাথি মেরেছেন। আমাকে ঘষটে নিয়ে গিয়েছেন। আপনারা নোংরা পুলিশ, দলদাস। আমাদের নামে মিথ্যে কেস দিয়েছেন। আমি জানি না, আমার মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছে, বাবা তুমি স্কুলে যাবে না? আমি উত্তর দিতে পারিনি। আমি জানি না আমার চাকরি আছে কি নেই। এই যন্ত্রণা আপনারা বুঝবেন না। আপনারা ঘেঁটে দিয়েছেন। এমন অবস্থা করে রেখে গিয়েছেন, নতুন যে সরকার এসেছে তার কাছে আমরা যে কোনও সুরাহা চাইব, সেটাও আমরা বুঝতে পারছি না। যে আপনাদের কাছে আমরা কী চাইব। অযোগ্যদের বাঁচানোর জন্য যোগ্যদের বলি দিয়েছেন আপনারা। আপনাদের মুখ্যমন্ত্রী নেতাজি ইন্ডোরে বলেছিলেন, এ, বি, সি, ডি প্ল্যান। কোথায় গেল সেই প্ল্যান? নতুন সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, যোগ্যদের সঙ্গে যে অন্যায়টা হয়েছে, তাঁদের OMR অনেক টাল বাহানার পর আপনারা বের করেছেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছিল ২ বছর আগেই। শপথ গ্রহণের দিনই আপনারা তা প্রকাশ করেছেন। সাধুবাদ জানাই। মুখ্যমন্ত্রী যে উদ্যোগগুলো নিয়েছেন একজন শিক্ষক হিসাবে, চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকদের প্রতিনিধি হিসাবে আমি বলছি সাধুবাদ জানাই মুখ্যমন্ত্রীর স্বচ্ছ নিয়োগের পরিকল্পনাকে।”

একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাছে হাত জোড় করে অনুরোধ জানালেন শিক্ষক অমিত রঞ্জন ভুইঞা। তিনি বললেন, “তার সঙ্গে আপনাদের কাছে কর জোড়ে একটা নিবেদন যে সব ৪০, ৪৫, ৫০ বছরের শিক্ষক ও শিক্ষকর্মীরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁদের চকড়িগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা আপনারা করুন। যে OMR আপনারা বের করেছেন সেই OMR-এর ভিত্তিতে আমাদের আলাদা করে সুপ্রিম কোর্টের কাছে আইনের মাধ্যমে আমাদের চাকরিগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমাদের পরিবরগুলোকে বাঁচান।”



Source link

Leave A Reply

Your email address will not be published.